অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়া মোকাবিলার কৌশল জানালেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ২০২৬

 

অগ্নিকাণ্ডের সময় আগুনের চেয়ে ধোঁয়াই মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় এবং তাৎক্ষণিক হুমকি হয়ে ওঠে—এ কথা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দেখা যায়, অধিকাংশ মানুষ আগুনে পুড়ে নয়, বরং ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে বা বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন কিংবা প্রাণ হারান। এমন প্রেক্ষাপটে অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়া মোকাবিলায় কী করণীয়, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক।

অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ার মোকাবিলা করতে না পেরে অনেকেই মারা যান


চিকিৎসকদের মতে, আগুন লাগার মুহূর্তে মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হয় আতঙ্কিত হয়ে দৌড়াদৌড়ি করা। কিন্তু এই আতঙ্কই অনেক সময় পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে। ধোঁয়ার মধ্যে কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হবে, কীভাবে শ্বাস নিতে হবে, কোথায় অবস্থান করা নিরাপদ—এসব বিষয়ে আগাম ধারণা থাকলে বহু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।


  • অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়া

  • অগ্নিকাণ্ডে করণীয়

  • আগুন লাগলে কী করবেন

  • ধোঁয়া থেকে বাঁচার উপায়

  • ফায়ার সেফটি টিপস

  • বার্ন ইনস্টিটিউট চিকিৎসক

ধোঁয়া কেন বেশি বিপজ্জনক

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক জানান, আগুন লাগার পরপরই বিভিন্ন দাহ্য বস্তু পুড়তে শুরু করে এবং সেখান থেকে কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, সায়ানাইডসহ নানা বিষাক্ত গ্যাস তৈরি হয়। এসব গ্যাস অতি অল্প সময়ের মধ্যেই মানুষের শ্বাসতন্ত্রে প্রবেশ করে অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ফলে মানুষ মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট, অচেতন হয়ে পড়া এমনকি মৃত্যুর মুখে পতিত হতে পারে।

বিশেষ করে বন্ধ স্থানে—যেমন বহুতল ভবন, মার্কেট, কারখানা বা বাসাবাড়িতে—ধোঁয়ার প্রভাব আরও মারাত্মক হয়। কারণ ধোঁয়া উপরের দিকে উঠলেও দ্রুত পুরো কক্ষে ছড়িয়ে পড়ে এবং দৃশ্যমানতা শূন্যের কোঠায় নেমে আসে।

অগ্নিকাণ্ডের সময় ধোঁয়া থেকে বাঁচার প্রাথমিক কৌশল

চিকিৎসক বলেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজেকে শান্ত রাখা। আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ালে শরীরে অক্সিজেনের চাহিদা বেড়ে যায় এবং বেশি ধোঁয়া শরীরে প্রবেশ করে।

তিনি ধোঁয়া মোকাবিলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলের কথা তুলে ধরেন—

১. নিচু হয়ে চলাচল করা
ধোঁয়া সাধারণত উপরের দিকে জমে থাকে। তাই আগুন লাগলে দাঁড়িয়ে না থেকে যতটা সম্ভব নিচু হয়ে বা হামাগুড়ি দিয়ে চলাচল করতে হবে। এতে তুলনামূলকভাবে পরিষ্কার বাতাস পাওয়া যায় এবং শ্বাস নেওয়া সহজ হয়।

২. ভেজা কাপড় ব্যবহার করা
সম্ভব হলে পরিষ্কার কাপড়, তোয়ালে বা রুমাল পানিতে ভিজিয়ে নাক ও মুখ ঢেকে রাখতে হবে। এতে কিছুটা হলেও ধোঁয়া ও বিষাক্ত কণা ফিল্টার হয়ে যায়।

৩. গভীর শ্বাস নেওয়া এড়িয়ে চলা
ধোঁয়ার মধ্যে থাকলে দ্রুত বা গভীর শ্বাস নেওয়া বিপজ্জনক। ছোট ও ধীর শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

৪. অযথা দরজা-জানালা খোলা নয়
আগুন লাগার সময় সব দরজা-জানালা খুলে দিলে অক্সিজেন প্রবেশ করে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাই পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ভবনের ভেতরে আটকা পড়লে করণীয়

অনেক সময় দেখা যায়, আগুন লাগার পর মানুষ ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে যান। এমন পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, সে বিষয়ে চিকিৎসক বিশেষভাবে সতর্ক করেন।

তিনি বলেন, যদি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে একটি কক্ষে আশ্রয় নিতে হবে। দরজার নিচে ভেজা কাপড়, চাদর বা তোয়ালে গুঁজে দিতে হবে, যাতে ধোঁয়া ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। জানালা খুলে বাইরে থেকে সাহায্যের সংকেত দিতে হবে—কাপড় নেড়ে বা আলো জ্বালিয়ে।

এ অবস্থায় কখনোই লিফট ব্যবহার করা যাবে না। লিফট হঠাৎ বন্ধ হয়ে যেতে পারে অথবা ধোঁয়ায় ভরে যেতে পারে, যা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা

চিকিৎসক জানান, শিশু, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী এবং হৃদরোগ বা শ্বাসকষ্টে ভোগা ব্যক্তিরা ধোঁয়ার প্রভাবে দ্রুত অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাই অগ্নিকাণ্ডের সময় তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে।

বিশেষ করে শিশুদের মুখ ও নাক ভালোভাবে ঢেকে রাখতে হবে এবং সম্ভব হলে কোলে নিয়ে নিচু হয়ে চলতে হবে। বৃদ্ধদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সময় ও সহায়তার প্রয়োজন হয়, তাই পরিবারের অন্য সদস্যদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

আগুন নেভানোর চেষ্টা কখন করা যাবে

অনেক সময় মানুষ আগুন লাগামাত্রই তা নেভানোর চেষ্টা করেন। চিকিৎসক বলেন, আগুন ছোট হলে এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকলে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, পানি বা বালু দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে আগুন বড় হলে বা ধোঁয়া দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে আগুন নেভানোর চেয়ে নিজের জীবন রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ধোঁয়ায় আক্রান্ত হলে প্রাথমিক চিকিৎসা

যদি কেউ ধোঁয়ায় আক্রান্ত হন, তাহলে তাকে দ্রুত খোলা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। আঁটসাঁট কাপড় ঢিলা করে দিতে হবে এবং প্রয়োজনে অক্সিজেন দিতে হবে। মাথা ঘোরা, বমি, শ্বাসকষ্ট বা অচেতন হয়ে পড়লে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক বলেন, অনেক সময় ধোঁয়ার প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। কয়েক ঘণ্টা পরেও ফুসফুসে জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই ধোঁয়ার মধ্যে অবস্থান করা যে কাউকে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

আগাম প্রস্তুতি জীবন বাঁচাতে পারে

চিকিৎসকের মতে, অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়া মোকাবিলায় সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আগাম প্রস্তুতি। প্রতিটি বাসা, অফিস ও প্রতিষ্ঠানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র থাকা উচিত এবং তা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ থাকা জরুরি। পাশাপাশি পরিবার বা কর্মস্থলে অগ্নিকাণ্ডের সময় বের হওয়ার পথ ও করণীয় সম্পর্কে আগেই আলোচনা করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, নিয়মিত ফায়ার ড্রিল, বৈদ্যুতিক সংযোগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দাহ্য বস্তু যথাযথভাবে সংরক্ষণ করলে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় সমাধান

সবশেষে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের এই চিকিৎসক বলেন, অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানি কমাতে হলে শুধু উদ্ধার কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করলে হবে না। সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়ানোই সবচেয়ে বড় সমাধান। ধোঁয়া কতটা ভয়ংকর, কীভাবে তা থেকে বাঁচতে হবে—এসব বিষয়ে গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে নিয়মিত প্রচার চালানো প্রয়োজন।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, মানুষ যদি ধোঁয়া মোকাবিলার সঠিক কৌশল সম্পর্কে সচেতন হন, তাহলে ভবিষ্যতে অনেক মূল্যবান প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে।

Previous Post